শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২২

প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

তারিখ: 07/02/2022

প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

নাঈম হোসেন 
মাতৃত্বকালীন ছুটি এক বছর চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি।
নাঈম হোসেন, 
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, 
                       আমার সালাম নিবেন। আমি একজন সাধারণ নাগরিক। আমার নাম মোঃ নাঈম হোসেন । আমার ঠিকানাঃ গ্রাম, পোষ্ট চরবংশী, ওয়ার্ডনং-৭, ২নং উত্তর চরবংশী ইউনিয়ন, ডাকঘর: চরবংশী খাসের হাট,  উপজেলাঃ রায়পুর, জেলাঃ লক্ষ্মীপুর, আমার মোবাইল নং০১৭২৬১০২৭১৫ আপনি কেমন আছেন? আশা করি, মহান দয়াময়ের অশেষ কৃপায় খুব ভালো আছেন! আমিও আপনার মত, মমতায়ী একজন মাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেয়ে অনেক খুশি এবং ভালো আছি।
পরসমাচার, 
                  মা আপনি অবগত আছেন যে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,  নারীদেরকে অনেক বেশী ভালোবাসতেন ও সম্মান করতেন। 
আপনি আরও জেনে অবাক হবেন যে, ইসলামের মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ‘নিসা’ অর্থাৎ ‘মহিলা’ শব্দটি ৫৭ বার এবং ‘ইমরাআহ’ অর্থাৎ ‘নারী’ শব্দটির ২৬ বার উল্লেখ হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ‘নিসা’ তথা ‘মহিলা’ শিরোনামে নারীর অধিকার ও কর্তব্যসংক্রান্ত একটি স্বতন্ত্র বৃহৎ সূরাও রয়েছে। এ ছাড়া কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও তাদের মূল্যায়ন সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। ইসলাম নারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছে। দিয়েছে নারীর জান-মালের নিরাপত্তা ও সর্বোচ্চ সম্মান।

আমাদের প্রিয় নবী (সঃ)ও, নারীদেরকে অনেক সম্মান ও মর্যাদা করতেন। নারীদের সম্মান বাড়িয়ে দিতে  মহানবী (সা.) ঘোষণা করেন, ‘যার রয়েছে কন্যাসন্তান, সে যদি তাকে (শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে) অবজ্ঞা ও অবহেলা না করে এবং পুত্রসন্তানকে তার ওপর প্রাধান্য না দেয়; আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা নারীদের উত্তম উপদেশ দাও (উত্তম শিক্ষায় শিক্ষিত করো)।’ হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘ইলম শিক্ষা করা (জ্ঞানার্জন করা) প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর প্রতি ফরজ (কর্তব্য)।’ (উম্মুস সহিহাঈন-ইবনে মাজাহ শরিফ)। ইসলাম নারীদের সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা দিয়েছে মা হিসেবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত’। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার এক লোক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দরবারে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশি অধিকারী কে? নবীজি (সা.) বললেন, ‘তোমার মা’। ওই লোক জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? তিনি উত্তর দিলেন ‘তোমার মা’। ওই লোক আবারও জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? এবারও তিনি উত্তর দিলেন ‘তোমার মা’। (বুখারি)। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ একে অন্যের পরিপূরক। 

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে রয়েছে, ‘তারা তোমাদের আবরণস্বরূপ আর তোমরা তাদের আবরণ।’ (সূরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৭)। স্ত্রীর গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘উত্তম স্ত্রী সৌভাগ্যের পরিচায়ক।’ (মুসলিম শরিফ)। তিনি আরও বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে–ই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি)। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণ করো।’ (সূরা-৪ নিসা, আয়াত: ১৯)। কোরআনে আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘নারীদের ওপর যেমন অধিকার রয়েছে পুরুষের, তেমনি রয়েছে পুরুষের ওপর নারীর অধিকার।’ (সূরা-২ বাকারা, আয়াত ২২৮)। 
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! 
                              আপনিও একজন মা। আপনি সমগ্র বাঙ্গালিদের মা। আপনি অতুলনীয়!  আপনি মহিয়সী! আমি আপনার একজন সন্তান হিসেবে, বাংলার সমগ্র মায়েদের কথা ভেবে আপনার কাছে একটা ছোট আবদার করতে চাই। আমার এ দাবি সমস্ত মায়েদের পক্ষে। 
মা আপনি নিশ্চয়ই জানেন ; একজন গর্ভধারী মায়ের , সন্তান গর্ভে আসা থেকে শুরু করে , সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত মাকে কতটা কষ্টের মহাসমুদ্র পার করতে হয়।
কষ্টের পর কষ্ট,একাধিক তীব্র যন্ত্রণা একজন  মাকে সহ‍্য করতে হয়। 
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! 
                            আপনি আরও জেনে অবাক  হবেন যে, ডাক্তারী তথ্য মতে , নারীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় হল গর্ভাবস্থা। শুধু মা নয়, তার শিশুর জীবন কীভাবে গড়ে উঠবে তা অনেকটাই  নির্ভর করে এ সময়ের ওপর। সৃষ্ট জগতের সবচাইতে অসাধারণ প্রক্রিয়া বোধহয় গর্ভধারণের মাধ্যমে একজন মানুষের সৃষ্টি। একটি মানব শিশুর জন্ম। ছোট একটি কোষ থেকে এক বিন্দু রক্ত কণিকা - তারপর গঠন হয় ছোট নরম তুলতুলে এক অপরূপ মানবশিশু। একজন মহিলার গর্ভধারণ থেকে শিশুজন্মের মাঝে মোট সময় মোটামুটি ৪০ সপ্তাহ। সর্বশেষ স্বাভাবিক মাসিক (মেনসচুরাল পিরিয়ড) থেকে সাধারণত সময়টি গননা করা হয়। দিনের হিসেবে বলা যেতে পারে ২৫০ থেকে ২৮৫ দিন । মোট সময়কালকে তিনটি ট্রাইমেস্টারে ভাগ করা হয়; প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়  ট্রাইমেস্টার । গর্ভধারনের ১ম থেকে ১৩ সপ্তাহকে ধরা হয়  প্রথম ট্রাইমেস্টার। দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার ১৪ থেকে ২৬ সপ্তাহ এবং তৃতীয় বা শেষ ট্রাইমেস্টার। ২৭ সপ্তাহ থেকে বাচ্চা জন্মের আগ পর্যন্ত সময়কাল। এ তিনটি ট্রাইমেস্টারই  একজন মাকে পার করতে হয় নানা সমস্যার মধ্যে দিয়ে, যা একজন গর্ভবতী মায়ের পক্ষে অসহনীয় যাতনার ও বেদনার। 

এই বেদনা আমাদের মতো অনেক পাষণ্ড পুরুষেরা বুঝেনা ও বুঝতে চেষ্টাও করে না ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! 
                            একজন মা গর্ভকালীন  সময়ে ৩টি ট্রাইমেস্টারে  যেসকল সমস্যার মোকাবেলা করেন তার একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা সকলের অবগতির জন্য তুলে ধরলাম আপনার কাছে এই চিঠিতে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
                             একজন মায়ের গর্ভাবস্থার প্রথম ট্রাইমেস্টারে যেসকল উপসর্গ দেখা দেয় তা হলো - ক্লান্তিবোধ, কোমরে এবং মেরুদণ্ডে ব‍্যাথা, রাতের বেলায় ভালো ঘুম না হওয়া, মুডসুইং কিংবা গর্ভধারণের লক্ষণগুলো নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগতে পারেন। আবার কিছু মায়েদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উদ্বেগ বা Anxiety কিংবা গর্ভকালীন হতাশা লক্ষ্য করা যায়। ফলে ঘন ঘন প্রসাবের বেগ হয়। তাছাড়া বমি বমি ভাব বা মর্নিংসিকনেস হয়। আমি আমার প্রিয়তমা স্ত্রীকে দেখেছি, প্রথম তিন মাসে এতোটা বমি করেছে যে, বমি করতে করতে কখনও সে জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আবার হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছে। এই অবস্থা নিয়ে একজন চাকরীজীবি  মায়ের জন্য অফিস করা সম্ভব হবে কী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? আর ডাক্তারও এসময় অনেক 
সাবধানে থাকতে বলেন। 
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!                      
                         আমাদের দেশে বর্তমান সংসদে আপনিসহ মোট  চারজন মা অনন্য মন্ত্রীর পদে রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী  হিসেবে আছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনি। ডা. দীপু মণি  শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নতুন মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন। 
বেগম মন্নুজান সুফিয়ান এবার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের। 
বেগম হাবিবুন নাহার উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।
আর বিদায়ী মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বেগম মেহের আফরোজ চুমকি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ে তারানা হালিম দায়িত্ব পালন করেছেন। 
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
                      আপনারা মা হয়ে কী একজন গর্ভবতী মায়ের কষ্ট কে উপলব্দি করবেননা?  একজন মা কি এতটুকু ইহসান পাওয়ার অধিকারী নয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? এটা কি নারীদের অধিকার নয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
                           আমি সমস্ত মায়েদের উপরে উল্লেখিত সকল সমস্যার কথা বিশেষ বিবেচনা করে, সরকারি আধা সরকারি চাকরি জীবি সকল মায়েদের পক্ষ হয়ে আপনার কাছে এই আবদার করছি, চাকরিরত সকল মায়েদের মাতৃত্বকালীণ ছুটি ছয় মাসের পরিবর্তে এক বছর করে দেওয়া হলে গর্ভকালীন নানা সমস্যায় তারা নিজ নিজ ঘরে বিশ্রামে থাকতে পারবে। 
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
                            হে আমার প্রিয় মা! আমি আমার প্রিয়তমা স্ত্রীকে খুব বেশী ভালোবাসি! আমি আমার স্ত্রীর কান্না দেখেছি! অসুস্থতা নিয়ে অফিস করা কতটা কষ্টের সেটা আমি উপলব্দি করেছি আমার প্রিয়তমার চোখের পানির মধ্যে। অফিস করা,অফিস আদেশ মেনে চলা এবং নিয়মকানুন রক্ষা করতে গিয়ে আমাদের দুটো সন্তান আমরা হারিয়েছি। আমার সহধর্মিণী শোকে প্রায় মানসিক রোগী । 

দ্বিতীয় আবার একটা সন্তানের জনক হতে পারব কিনা সেটাও ভাগ্য বিধাতা জানে?আর যেন কোন মাকে এরকম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা নিয়ে অফিস করে সন্তান না হারাতে হয়, সেজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার কাছে আমার এ চিরুকুট। আর আমি পৃথিবীর সকল নারীদেরকে অনেক সম্মান ও শ্রদ্ধা করি। একটা দুর্ঘটনা সারাজীবনের কান্না। তাই  প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মূহুর্ত, এই স্লোগান কে সামনে রেখে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার কাছে বিনীত অনুরোধ করছি, উপরে বর্ণিত সকল সমস্যা ও নারীর মর্যাদা এবং অধিকারের কথা বিশেষ বিবেচনা করে, যাতে সকল চাকরিজীবি মায়েরা মাতৃত্বকালীন ছুটি এক বছর পায় তার জন্য বঙ্গমাতা হিসেবে আপনার কাছে আকুল আবেদন রইল। 
পরিশেষে আপনার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু জীবন কামনা করছি। 
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! 
                        আমি আশা করি আপনার একজন সন্তান হিসেবে আমি আমার পত্রের উত্তর পাবো। আল্লাহ হাফেজ।
          সমাপ্ত ৷৷

বিশেষ দ্রষ্টব্য : কপিরাইট সংরক্ষিত ৷

কোন মন্তব্য নেই:

যে আমল করলে রহমত নাজিল হয় এবং যে কাজ করতে আল্লাহ বারণ করেছেনঃ লেখক নাঈম হোসেন

  যে আমল করলে রহমত নাজিল হয় এবং যে কাজ করতে আল্লাহ বারণ করেছেনঃ  লেখক নাঈম হোসেন  একজন মুসলমান অপর আরেকজন মুসলমানের ভাই৷ মহান আল্লাহ তাআলা ...