কোরআন ও হাদীসের আলোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কোরআন ও হাদীসের আলোচনা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২২

যে পাপের শাস্তি দুনিয়াতে দেওয়া হয় লেখক নাঈম হোসেন

 যে পাপের শাস্তি দুনিয়াতে দেওয়া হয়

লেখক নাঈম হোসেন
মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত, কিন্তু মানুষ তার কর্মের মাধ্যমে উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট হতে পারে৷ 

সর্বদা পাপ করতে থাকলে  মানুষ আর মানুষ থাকেনা ৷ ধীরে ধীরে মানুষের বিবেক বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়, তখন সর্বদা ভুল পথে চলতে থাকে৷ 
পশুত্ব স্বভাব তার মধ্যে বসবাস করে, সত্যকে সে ভুলে যায়, মিথ্যাকে সে সত্য রুপে প্রমাণ করাতে মরিয়া হয়ে উঠে ৷ 
অনেক পাপকর্ম করার পর নানারকম যুক্তি খুঁজতে থাকে , একসময় সে পাপকে পাপের বিপক্ষে অনেকগুলো যুক্তি দাঁড় করিয়ে বলে এটা পাপ হবে কেন? এর মাধ্যমে তো এই উপকার আছে ৷ সে তখন একটা পাপকার্য কে ভালো কার্যে প্রমাণ করতে ইবলিসের মতো একাধিক যুক্তি দাঁড় করাতে থাকে৷ আর ইবলিস ইতিপূর্বে আল্লার নির্দেশের সামনে যুক্তি পেশ করে বলেছিল ,  আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর আদমকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে ৷ অতএব , আমি আদম থেকে উত্তম৷  কারণ , আগুনের ধর্ম হচ্ছে উপরের দিকে ওঠা আর মাটির ধর্ম হচ্ছে নিচের দিকে থাকা তাই আমি উপরের হয়ে নিচে থাকা মাটির তৈরি আদমকে সেজদা করতে পারবো না৷ যেমন পবিত্র কোরআনের ভাষায় মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন , [১] আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যখন তোকে হুকুম দিয়েছিলাম তখন সিজদা করতে তোকে বাধা দিয়েছিল কিসে?” সে জবাব দিলঃ “আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছো এবং ওকে সৃষ্টি করেছো মাটি থেকে।” [২] জবাবে আল্লাহ বললেন ; ঠিক আছে, তুই এখান থেকে নীচে নেমে যা। এখানে অহংকার করার অধিকার তোর নেই। বের হয়ে যা। আসলে তুই এমন লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যারা নিজেরাই নিজেদেরকে লাঞ্ছিত করতে চায়।”

এজন্য কোন পাপকার্য কে ছোট মনে করা যাবে না ৷ আর পাপ থেকে বিরত থাকার সবসময় চেষ্টা করতে হবে৷ 
মানুষ যে পাপকার্য করুক না কেন আল্লাহ যদি তা ক্ষমা না করেন , তাহলে পরকালে তো সে পাপের শাস্তি দিবেন ই বরং কিছু কিছু পাপের শাস্তি জীবিত থাকতে দুনিয়াতেও দিবেন ৷ 
যেমন আল্লাহ বলেন , [৩] সেই বড় শাস্তির পূর্বে আমি এদুনিয়াতেই (কোন না কোন) ছোট শাস্তির স্বাদ তাদেরকে আস্বাদন করাতে থাকবো, হয়তো তারা (নিজেদের বিদ্রোহাত্মক নীতি থেকে) বিরত হবে।

এখানে  তাফসিরের ভাষায় "বড় শাস্তি” বলতে আখেরাতের শাস্তিকে বুঝানো হয়েছে। কুফরী ও ফাসেকীর অপরাধে এ শাস্তি দেয়া হবে। এর মোকাবিলায় “ছোট শাস্তি” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে এ দুনিয়ায় মানুষ যেসব কষ্ট পায় সেগুলো। যেমন ব্যক্তিগত জীবনে কঠিন রোগ, নিজের প্রিয়তম লোকদের মৃত্যু, ভয়াবহ দুর্ঘটনা, মারাত্মক ক্ষতি, ব্যর্থতা ইত্যাদি।

সামাজিক জীবনে ঝড়-তুফান, ভূমিকম্প, বন্যা, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, যুদ্ধ এবং আরো বহু আপদ-বিপদ, যা লাখো লাখো কোটি কোটি মানুষকে প্রভাবিত করে। এসব বিপদ অবতীর্ণ হওয়ার প্রয়োজন ও কল্যাণকর দিক বর্ণনা করে বলা হয়েছে, এর ফলে বড় শাস্তি ভোগ করার আগেই যেন মানুষ সচেতন হয়ে যায় এবং এমন চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি ত্যাগ করে যার পরিণামে তাদেরকে এ বড় শাস্তি ভোগ করতে হবে।

অন্যকথায় এর অর্থ হবে, দুনিয়ায় আল্লাহ‌ মানুষকে একেবারেই পরমানন্দে রাখেননি। নিশ্চিন্তে ও আরামে জীবনের গাড়ি চলতে থাকলে মানুষ এ ভুল ধারণায় লিপ্ত হয়ে পড়বে যে, তার চেয়ে বড় আর কোন শক্তি নেই যে, তার কোন ক্ষতি করতে পারে। বরং আল্লাহ‌ এমন ব্যবস্থা করে রেখেছেন যার ফলে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি, জাতি ও দেশের ওপর এমন সব বিপদ-আপদ পাঠাতে থাকেন, যা তাদেরকে একদিকে নিজেদের অসহায়তা এবং অন্যদিকে নিজেদের চেয়ে বড় ও উর্ধ্বে একটি মহাপরাক্রমশালী সর্বব্যাপী শাসন ব্যবস্থার অনুভূতি দান করে।

এ বিপদ প্রত্যেকটি ব্যক্তি, দল ও জাতিকে একথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তোমাদের ভাগ্য ওপরে অন্য একজন নিয়ন্ত্রণ করছেন। সবকিছু তোমাদের হাতে দিয়ে দেয়া হয়নি। আসল ক্ষমতা রয়েছে তার হাতে যিনি কর্তৃত্ব সহকারে এসব কিছু করে চলছেন। তার পক্ষ থেকে যখনই কোন বিপদ তোমাদের ওপর আসে, তার বিরূদ্ধে কোন প্রতিরোধ তোমরা গড়ে তুলতে পারো না এবং কোন জ্বিন, রূহ, দেব-দেবী, নবী বা অলীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেও তার পথ রোধ করতে সক্ষম হও না।

এদিক দিয়ে বিচার করলে এ বিপদ নিছক বিপদ নয় বরং আল্লাহর সতর্ক সংকেত। মানুষকে সত্য জানাবার এবং তার বিভ্রান্তি দূর করার জন্য একে পাঠানো হয়। এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে যদি মানুষ দুনিয়াতেই নিজের বিশ্বাস ও কর্ম শুধরে নেয় তাহলে আখেরাতে আল্লাহর বড় শাস্তির মুখোমুখি হবার তার কোন প্রয়োজনই দেখা দেবে না।

অপরদিকে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস , নবীজি (সাঃ) বলেছেনঃ [৪] 

" কোন জাতির মধ্যে আত্মসাৎ বৃদ্ধি পেলে সে জাতির লোকদের অন্তরে ভয়ের সঞ্চার করা হয়৷ 

কোন জাতির মধ্যে ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়লে সে জাতির মধ্যে মৃত্যুর হার বেড়ে যায় ৷ 

কোন সম্প্রদায়ের লোকেরা পরিমাপের সময় ওজনে কম দিলে তাদের রিজিক সংকুচিত করা হয়৷ 

কোনো জাতির লোকেরা অন্যায়ভাবে বিচার - ফয়সালা করলে তাদের মধ্যে রক্তপাত বিস্তৃতি লাভ করে ৷ 

কোন জাতি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে আল্লাহ তাদের ওপর শত্রুদল চাপিয়ে দেন৷ " 

এ হাদীস থেকে সহজেই বুঝা যায় যে , যেসকল শাস্তির কথা বলা হয়েছে তা পার্থিব জীবনেই মানুষ ভোগ করবে৷ 
আবার এসকল শাস্তি সকলের ক্ষেত্রে সমান নয়, কারও শাস্তি হবে অসুস্থতার মাধ্যমে  , কাউকে আবার অসহায়ত্বের মাধ্যমে , কাউকে আবার ঈমান হরণের মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হয়৷ 

ব্যভিচারীর শাস্তি সম্পর্কে হাদিসে বলা হয়েছে , [৫] " কোন মানুষ যখন ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন তার ভেতর থেকে ঈমান বেড়িয়ে যায় এবং এটি তার মাথার উপর মেঘখণ্ডের মতো ভাসতে থাকে ৷ অতঃপর সে যখন তাওবা করে , তখন ঈমান আবার তার কাছে ফিরে আসে৷ " 

ব্যভিচার সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন , [৬] "  যিনার কাছেও যেয়ো না, ওটা অত্যন্ত খারাপ কাজ এবং খুবই জঘন্য পথ।

তাফসীর কারক এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ “যিনার কাছেও যেয়ো না” এ হুকুম ব্যক্তির জন্য এবং সামগ্রিকভাবে সমগ্র সমাজের জন্যও। ব্যক্তির জন্য এ হুকুমের মানে হচ্ছে, সে নিছক যিনার কাজ থেকে দূরে থেকেই ক্ষান্ত হবে না বরং এ পথের দিকে টেনে নিয়ে যায় যিনার এমন সব সূচনাকারী এবং প্রাথমিক উদ্যোগ ও আকর্ষণ সৃষ্টিকারী বিষয় থেকেও দূরে থাকবে। আর সমাজের ব্যাপারে বলা যায়, এ হুকুমের প্রেক্ষিতে সমাজ জীবনে যিনা, যিনার উদ্যোগ-আকর্ষণ এবং তার কারণসমূহের পথ বন্ধ করে দেয়া সমাজের জন্য ফরয় হয়ে যাবে। এ উদ্দেশ্যে সে আইন প্রণয়ন, শিক্ষা ও অনুশীলন দান, সামাজিক পরিবেশের সংস্কার সাধন, সমাজ জীবনের যথাযোগ্য বিন্যাস এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যবস্থা অবলম্বন করবে।

এ ধারাটি শেষ পর্যন্ত ইসলামী জীবন ব্যবস্থার একটি বৃহত্তম অধ্যায়ের বুনিয়াদে পরিণত হয়। এর অভিপ্রায় অনুযায়ী যিনা ও যিনার অপবাদকে ফৌজদারী অপরাধ গণ্য করা হয়। পর্দার বিধান জারী করা হয়। অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতার প্রচার কঠোরভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। মদ্যপান, নাচ, গান ও ছবির (যা যিনার নিকটতম আত্মীয়) ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। আর এ সঙ্গে এমন একটি দাম্পত্য আইন প্রণয়ন করা হয় যার ফলে বিবাহ সহজ হয়ে যায় এবং এ যিনার সামাজিক কারণসমূহের শিকড় কেটে যায়।

অন্যএকটি হাদীসে বলা হয়েছে , [৭] " যখন কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে অশ্লীলতা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়বে যে তারা প্রকাশ্যে  অশ্লীলতায় লিপ্ত হতে থাকবে , তখন তাদের মধ্যে এমন সব দুরারোগ্য ব্যাধির সংক্রমণ হবে,  যা তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছিলনা৷ " 

দুনিয়াতে  পাপের শাস্তি হিসেবে বিপর্যয় বলতে, [৮] দুর্ভিক্ষ , মহামারী , অগ্নিকাণ্ড , পানিতে নিমজ্জিত হওয়া , সবকিছু থেকে বরকত উঠে যাওয়া , উপকারী বস্তুর উপকার কম হওয়া ইত্যাদি আপদ বিপদ বোঝানো হয়েছে৷  

ওজনে কম দেওয়া জঘন্যতম খেয়ানত ও কবীরা গুনাহ ৷ ওজনে কম দেওয়ার শাস্তি হিসেবে দুনিয়াতে মানুষের ক্ষেতখামারে ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দেন ও দুর্ভিক্ষ অবতীর্ণ করেন৷ 
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন , [৯] " ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়। আয়াতে তাফসীর কারকের পপরিভাষায়  তাফীফ মানে হচ্ছে মাপে ও ওজনে চুরি করা। কারণ এ কাজ করার সময় এক ব্যক্তি মাপ ও ওজনের মাধ্যমে কোন বড় পরিমাণ জিনিস চুরি করে না। বরং হাত সাফাইয়ের মাধ্যমে প্রত্যেক ক্রেতার অংশ থেকে সামান্য সামান্য করে বাঁচিয়ে নেয়। ফলে বিক্রেতা কি জিনিস কতটুকু চুরি করেছে ক্রেতা তা টেরও পায় না।
 
এরপর আল্লাহ বলেন ,  তাদের অবস্থা এই যে, লোকদের থেকে নেবার সময় পুরোমাত্রায় নেয়  এবং তাদেরকে ওজন করে বা মেপে দেবার সময় কম করে দেয়৷" 

কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে ওজনে ও মাপে কম করার কঠোর নিন্দা এবং সঠিকভাবে ওজন ও পরিমাণ করার জন্য কড়া তাগিদ করা হয়েছে। 

আল্লাহ তাআলা পবিত্র  কুরআনে বলেন, [১০] “ইনসাফ সহকারে পুরো ওজন ও পরিমাপ করো। আমি কাউকে তার সামর্থ্যের চাইতে বেশীর জন্য দায়িত্বশীল করি না।”

অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছেঃ [১১]  “মাপার সময় পুরো মাপবে এবং সঠিক পাল্লা দিয়ে ওজন করবে।” 

আবাব আল্লাহ ইরশাদ করেন , [১২]   “ওজনে বাড়াবাড়ি করো না, ঠিকভাবে ইনসাফের সাথে ওজন করো এবং পাল্লায় কম করে দিয়ো না।

শো’আইবের সম্প্রদায়ের ওপর এ অপরাধের কারণে আযাব নাযিল হয় যে, তাদের মধ্যে ওজনে ও মাপে কম দেবার রোগ সাধারণভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং হযরত শো’আইব (আঃ) এর বারবার নসীহত করা সত্ত্বেও এ সম্প্রদায়টি এ অপরাধমূলক কাজটি থেকে বিরত থাকেনি।

মা- বাবার অবাধ্যতার শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে , সন্তানের জন্য দুনিয়াতে জান্নাত এবং  জাহান্নাম হচ্ছেন বাবা -মা ৷ 
যে ব্যক্তি মা - বাবার হক আদায় করতে পারবে সে দুনিয়াতেই পাবে জান্নাতের সুঘ্রাণ ৷ আর যে ব্যক্তি তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে , দুনিয়াই তার জন্য হবে জাহান্নাম ৷ মৃত্যুর আগে অবশ্যই সে ব্যক্তি মা- বাবার অবাধ্যতার শাস্তি ভোগ করবে৷ 

এসম্পর্কে হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস , [১৩] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন ," সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক ! নবী (সাঃ) এরুপ, তিনবার বললেন৷  সাহাবারা জিঞ্জাসা করলেন ; ইয়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন ব্যক্তি ? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন , যে তার বৃদ্ধা পিতা- মাতাকে পেল অথবা তাদের একজনকে পেল কিন্তু তাদের খেদমত করে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না৷ " 

কারও প্রতি অন্যায় বা  জুলুম করলে এই পাপের জন্য পরকালে তো আযাব রয়েছেই , দুনিয়াতেও রয়েছে কঠিন পরিণতি , এসম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস [১৪] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ " তুমি মজলুমের ফরিয়াদকে ভয় করো, কেননা তার ফরিয়াদের মাঝে এবং আল্লাহর মাঝে কোন পর্দা থাকে না ৷ " 

আবার হযরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত  একটি হাদীসে দেখা যায় যে, [১৫] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, " যে ব্যক্তি কোন মুসলমান ভাইয়ের প্রতি মানসম্মান বা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুম করে , তবে সে যেন তার কাছ থেকে সেদিন আসার আগে আজই মাফ করিয়ে নেয়, যেদিন তার কাছে দেরহাম ও দিনার কিছুই থাকবে না ৷ সেদিন তার কাছে যদি কোন আমল থাকে , তবে তার জুলুম পরিমাণ নেকি নিয়ে নেওয়া হবে ৷ আর তার কাছে নেকিও না থাকলে মজলুম ব্যাক্তির গুনাহ গুলো তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে৷ " 

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন , [১৬] " আর আদ ও সামূদ কে আমি ধ্বংস করেছি। তারা যেখানে থাকতো সেসব জায়গা তোমরা দেখেছো তাদের কার্যাবলীকে শয়তান তাদের জন্য সুদৃশ্য বানিয়ে দিল এবং তাদেরকে সোজা পথ থেকে বিচ্যুত করলো অথচ তারা ছিল বুদ্ধি সচেতন।" 

আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে বলা হয়েছে , আরবের যেসব এলাকায় এ দু’ টি জাতির বসতি ছিল আরবের প্রতিটি শিশুও তা জানতো। দক্ষিণ আরবের যেসব এলাকা বর্তমানে আহকাফ, ইয়ামান ও হাদরা মাউত নামে পরিচিত প্রাচীনকালে সে এলাকাগুলোতে ছিল আদ জাতির বসবাস। আরবের লোকেরা একথা জানতো। হিজাযের দক্ষিণ অংশে রাবেগ থেকে আকাবাহ পর্যন্ত এবং মদিনা ও খাইবার থেকে তাইমা ও তাবুক পর্যন্ত সমগ্র এলাকা সামূদ জাতির ধ্বংসাবশেষে পরিপূর্ণ দেখা যায়। কুরআন নাযিল হবার যুগে এ ধ্বংসাবশেষগুলোর অবস্থা বর্তমানের তুলনায় আরো বেশি সু্‌স্পষ্ট থেকে থাকবে। 

অপরদিকে আয়াতে বলা হয়েছে যে তারা  অজ্ঞ ও মূর্খ ছিল না। তারা ছিল তদানীন্তন যুগের শ্রেষ্ঠ সুসভ্য ও প্রগতিশীল লোক। নিজেদের দুনিয়ার কার্যাবলী সম্পাদন করার ব্যাপারে তারা পূর্ণ জ্ঞান বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতো। তাই একথা বলা যাবে না যে, শয়তান তাদের চোখে ঠুলি বেঁধে দিয়ে বুদ্ধি বিনষ্ট করে দিয়ে নিজের পথে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। বরঞ্চ তারা ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে চিন্তে ও খোলা চোখে শয়তান যে পথে পাড়ি জমিয়েছিল এবং এমন পথ পরিহার করেছিল যা তাদের কাছে নীরস, বিস্বাদ এবং নৈতিক বিধি-নিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ হবার কারণে কষ্টকর মনে হচ্ছিল।
 
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন, " আর কারূন, ফেরাঊন ও হামানকে আমি ধ্বংস করি। মূসা তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শন নিয়ে আসে কিন্তু তারা পৃথিবীতে অহংকার করে অথচ তারা অগ্রগমনকারী ছিল না।" 

অর্থাৎ পালিয়ে আল্লাহর পাকড়াও থেকে আত্মরক্ষা করার ক্ষমতা ছিল না। আল্লাহর কৌশল ব্যর্থ করে দেবার ক্ষমতা তাদের ছিল না। 

তারপর আল্লাহ বলেন,  "শেষ পর্যন্ত প্রত্যেককে আমি তার গুনাহের জন্য পাকড়াও করি। তারপর তাদের মধ্য থেকে কারোর ওপর আমি পাথর বর্ষণকারী বাতাস প্রবাহিত করি এবং কাউকে একটি প্রচণ্ড বিষ্ফোরণ আঘাত হানে আবার কাউকে আমি ভূগর্ভে প্রোথিত করি  এবং কাউকে ডুবিয়ে দিই। আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুমকারী ছিলেন না কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করছিল।

এই আয়াতটির ব্যাখ্যায় তাফসিরে বলা হয়েছে যে, আদ জাতি। তাদের ওপর অবিরাম সাত রাত ও আট দিন পর্যন্ত ভয়াবহ তুফান চলতে থাকে। আর  সামূদ,  কারূন,  ফেরাউন ও হামান। এ পর্যন্ত যেসব বক্তব্য শুনানো হলো সেগুলোর বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল দুটি।

একদিকে এগুলো মু’মিনদেরকে শোনানো হয়েছে, যাতে তারা হিম্মতহারা, ভগ্ন হৃদয় ও হতাশ না হয়ে পড়ে এবং বিপদ ও সংকটের কঠিন আবর্তেও ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও দৃঢ়তা সহকারে সত্য ন্যায়ের ঝাণ্ডা উঁচু করে রাখে যে, শেষ পর্যন্ত তাঁর সাহায্য অবশ্যই এসে যাবে, তিনি জালেমদেরকে লাঞ্ছিত করবেন এবং সত্যের ঝাণ্ডা উঁচু করে দেবেন।

অন্যদিকে এগুলো এমন জালেমদেরকে শুনানো হয়েছে যারা তাদের ধারণামতে ইসলামী আন্দোলকে সমূলে উচ্ছেদ করে দেবার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় নিয়োজিত ছিল।

তাদেরকে সতর্ক দেয়া হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর সংযম ও সহিষ্ণুতার ভুল অর্থ গ্রহণ করছো। তোমরা আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বকে একটি অরাজক রাজত্ব মনে করছো।

তোমাদের যদি এখন পর্যন্ত বিদ্রোহ, সীমালংঘন, জুলুম, নিপীড়ন ও অসৎকাজের জন্য পাকড়াও না করা হয়ে থাকে এবং সংশোধিত হবার জন্য অনুগ্রহ করে দীর্ঘ অবকাশ দেয়া হয়ে থাকে, তাহলে তোমরা নিজে নিজেই একথা মনে করে বসো না যে, এখানে আদতে কোন ইনসাফকারী শক্তিই নেই এবং এ ভূখণ্ডে লাগামহীনভাবে অনন্তকাল পর্যন্ত যা ইচ্ছে তাই করে যেতে পারবে। এ বিভ্রান্তি শেষ পর্যন্ত তোমাদেরকে এমন পরিণতির সম্মুখীন করবেই ইতিপূর্বে নূহের জাতি, লূতের জাতি ও শু’আইবের জাতি যার সম্মুখীন হয়েছিল, আদ ও সামূদ জাতিকে যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল এবং কারুন ও ফেরাউন যে পরিণতি স্বচক্ষে দেখে নিয়েছিল।

পবিত্র কোরআনে সামুদ জাতির পরিণতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন , " তাই সামূদকে একটি কঠিন মহা বিপদ দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।"  

এ সম্পর্কে সূরা আ'রাফের ৭৮ আয়াতে একে اَلرَّجْفَة (প্রচণ্ড ভূমিকম্প) বলা হয়েছে। সূরা হূদের ৬৭ আয়াতে এ জন্য اَلصَّيْحَةٌ (প্রচণ্ড বিষ্ফোরণ) শব্দ ব্যবহৃত হয়ে হয়েছে।

সূরা হা-মীম আস সাজদার ১৭ আয়াতে বলা হয়েছে যে, তাদেরকে صَاعِقَةٌ الْعَذَابِ(আযাবের বজ্র ধ্বনি) এসে পাকড়াও করলো। এখানে সে একই আযাবকেاَلطَاغِيَةٌ (অতিশয় কঠিন দুর্ঘটনা) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি একই ঘটনার বিভিন্ন অবস্থার বর্ণনা মাত্র।

পরবর্তী আলোচনায় আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেনঃ  "আর আদকে কঠিন ঝঞ্ঝাবাত্যা দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।" 
 
যা তিনি সাত রাত ও আট দিন ধরে বিরামহীনভাবে তাদের ওপর চাপিয়ে রেখেছিলেন। (তুমি সেখানে থাকলে) দেখতে পেতে তারা ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ে আছে যেন খেজুরের পুরানো কাণ্ড।

তুমি তাদের কাউকে অবশিষ্ট দেখতে পাচ্ছো কি?

তাদের পাপের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তাআলা তাদেরক নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন৷ 

মহান  আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল পাপকার্য হতে বিরত থাকার তৌফিক দান করুন ৷ আমীন৷৷ 
                        সমাপ্ত ৷৷ 
বিশেষ দ্রষ্টব্য : কপিরাইট সংরক্ষিত ৷ 

তথ্যসূত্র: 
[১]  সূরা আরাফ , আয়াত -১২৷ 
[২] সূরা আরাফ , আয়াত -১৩৷ 
[৩] সূরা সিজদা আয়াত ২১৷ 
[৪]  মুয়াত্তা মালেক: ১৩২৩৷ 
[৫]  আবু দাউদ : ৪৬৯০৷ 
[৬] সূরা বনী ইসরাঈল আয়াত :৩২৷ 
[৭] ইবনে মাজাহ ৷ 
[৮] তাফসিরে রুহুল মাআনি ৷ 
[৯] সূরা মুতাফফিফিন , আয়াত : (১-৩)৷ 
[১০] সূরা আন’আম , আয়াত : ১৫২৷ 
[১১] সূরা বনী ইসরাঈলে আয়াত : ৩৫৷ 
[১২] সূরা রহমান আয়াত : ৮-৯ ৷ 
[১৩]  মুসলিম ২/৩১৪৷ 
[১৪]  বুখারী :২২৮৬৷ 
[১৫] মেশকাত: ৪৮৯৯৷ 
[১৬] সূরা আনকাবূত : আয়াত : ৩৮- ৪০৷ 
[১৭] সূরা আল হাককাহ, (৫-৮) আয়াত৷ 

বিশেষ দ্রষ্টব্য : কপিরাইট সংরক্ষিত ৷ 


যে আমল করলে রহমত নাজিল হয় এবং যে কাজ করতে আল্লাহ বারণ করেছেনঃ লেখক নাঈম হোসেন

  যে আমল করলে রহমত নাজিল হয় এবং যে কাজ করতে আল্লাহ বারণ করেছেনঃ  লেখক নাঈম হোসেন  একজন মুসলমান অপর আরেকজন মুসলমানের ভাই৷ মহান আল্লাহ তাআলা ...